রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন
আকাশের অজানায় মহাকাশের রহস্যময় দরজা খুলে দিল চিলির রুবিন মানমন্দির
অনলাইন ডেস্ক
শুধু একটি ছবি, আর তাতেই ধরা দিল মহাশূন্যের অজস্র অজানা গল্প—দুই হাজারের বেশি গ্রহাণু, লাখ লাখ গ্যালাক্সি আর কয়েক হাজার আলোকবর্ষ দূরের নীহারিকা! এমন দৃশ্যপট আগে কখনো দেখেনি পৃথিবী।
দুই দশক ধরে চিলির আন্দিজ পর্বতমালার ওপর নির্মিত রুবিন অবজারভেটরি যেন এক বিশাল সময়যন্ত্র, যা মহাবিশ্বের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের কাহিনি বলে দেয় এক ঝলকে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল ক্যামেরা—লার্জ সিনপটিক সার্ভে টেলিস্কোপ (LSST)। এই ক্যামেরা দিয়ে তোলা প্রথম ছবিতেই উন্মোচিত হলো বিস্ময়কর এক মহাজাগতিক দৃশ্যপট—২১০৪টি নতুন গ্রহাণু, যার মধ্যে সাতটি পৃথিবীর একেবারে কাছাকাছি!
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের চিফ অফ স্টাফ ব্রায়ান স্টোন জানালেন, এই ক্যামেরার দৃষ্টিশক্তি এতটাই শক্তিশালী যে, ইতিহাসের সব অপটিক্যাল টেলিস্কোপকে পেছনে ফেলে দিয়েছে রুবিন। একে বলা হচ্ছে মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ স্ক্যানার।
রুবিন টিমের বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, টেলিস্কোপটির লেন্স প্রতি রাতেই হাজার হাজার ছবি তোলে। প্রতিটি ছবি যেন মহাবিশ্বের এক টুকরো ইতিহাস। সেখান থেকে পরিবর্তনের নিরিখে খোঁজা হয় নতুন গ্রহাণু, ধূমকেতু বা মহাকাশীয় শিলা। এটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেন ধুলোমলিন কোনো নীহারিকার মাঝেও ক্ষুদ্র ও দুর্বল আলোর কণিকাকে চিনে নিতে পারে।
সৌরজগতের মধ্য দিয়ে ছুটে চলা আন্তনাক্ষত্রিক ধূমকেতু বা শিলাগুলো শনাক্ত করতে পারছে ক্যামেরাটি। অর্থাৎ, নতুন গ্রহাণু বা ধূমকেতু পৃথিবীর দিকে আসার আগেই এর সংকেত পাওয়া যাবে—এ যেন মহাজাগতিক সতর্কবার্তার এক মহা প্রকল্প!
প্রথম আলোকচিত্রে পাওয়া গেছে এক মহাজাগতিক ‘মোজাইক’। মোট ৬৭৮টি পৃথক ছবি একত্র করে বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন এই রঙিন চিত্রপট। যেখানে দেখা গেছে দূরের দুই নীহারিকা—ত্রিফিড ও লেগুন। এদের অবস্থান পৃথিবী থেকে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ দূরে। গ্যাস আর ধুলার দোলা খেলে গেছে যেন পুরো আকাশজুড়ে। এই ছবি প্রমাণ করছে, LSST ক্যামেরা শুধু বিজ্ঞান নয়, মহাকাশের শিল্পও তুলে আনতে পারছে।
প্রাথমিক ছবিগুলোর ভেতর থেকে ১১০০টিরও বেশি চিত্র নিয়ে বিজ্ঞানীরা বানিয়েছেন একটি ভিডিও, যা মহাবিশ্বের সময়ের গতিপথকে তুলে ধরে। আলোর পরিবর্তনের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে কোন গ্রহাণু কীভাবে নড়ে-চড়ে, কোথা থেকে আসছে, কোন দিকে যাচ্ছে। এক কথায়—রুবিন মানমন্দির মহাবিশ্বের ডায়রির পাতা উল্টে দিচ্ছে একের পর এক।
রুবিন অবজারভেটরি এখন শুধু চিলির নয়, পুরো পৃথিবীর জন্য এক আশ্চর্য জানালা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে অনন্ত নক্ষত্রলোকের গোপন রহস্য। ইউসরা আল সাইয়্যাদ জানিয়েছেন, প্রথম এই ছবি শুধু শুরুর বার্তা। সামনে আরও চমক অপেক্ষা করছে।
আজকের এই প্রযুক্তির যুগে রুবিন অবজারভেটরির মতো প্রকল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বহির্বিশ্বের অজানাকে জানার নেশা এখনও জীবন্ত। একদিন হয়তো এখানেই ধরা পড়বে এমন কোনো মহাজাগতিক সংকেত, যা পাল্টে দিতে পারে আমাদের মহাবিশ্বকে বোঝার ধরন।
সূত্র: সিএনএন, ম্যাশেবল